বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১০:০৮

দৈশিক জাতীয়তাবাদ ও বৈশ্বিক উম্মাহ-চেতনা

লিখেছেন আবদুল হক ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২, রাত ০৮:৪৬

১  এই লেখা সহজ ও সহজের

জাতীয়তাবাদ পানির মতো সহজ এবং বরফের মতো কঠিন একটি বিষয়। জাতীয়তাবাদের ধারণা সর্বজনীন, কিন্তু তত্ত্ব বিজ্ঞজনীন। এর তাত্ত্বিক রূপ ও মূল্য নিয়ে গভীর কৌতূহল, কিঞ্চিৎ পড়াশোনা ও সামান্য চিন্তাভাবনা আমার আছে। কিন্তু এইটুকু দিয়ে বিজ্ঞজনকে তত্ত্ব বোঝানো যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তার দরকারও নেই। বিজ্ঞ মানুষেরা যে বহুকিছু জানেন ও বোঝেন, এটা খুব ভালো; তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা তাঁরা সমাজে গরিষ্ঠ নন, লঘিষ্ঠ। বিজ্ঞের তত্ত্বজ্ঞানের চে’ সমাজে যারা গরিষ্ঠ, সেই সহজ লোকদের সরল সত্যজ্ঞান বেশি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ তারা সমাজ বদলায়, নির্ণয় করে সমাজ-চারিত্র। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক কালক্রমে জাতীয়তাবাদ নিয়ে অনেককিছুই ঘটে গেছে: রাজনীতিবিদরা তর্ক করেছেন, পণ্ডিতরা বিশ্লেষণ করেছেন, চিন্তাবিদ লেখকরা বই লিখেছেন। সেসব রচনাবলি মননশীল পাঠকদের। আমার এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের নিবেদন একান্তই আমজনতার কাছে, যাঁরা তেল-নুন আর ধর্মকর্ম নিয়ে সাদাসিধে জীবনযাপন করেন।


২  জাতীয়তাবাদ বোঝার দরকার কী?

আসুন তাহলে, বিসমিল্লাহ্ বলে শুরু করা যাক। মুশকিল হলো, এই শুরুতেই তর্ক উঠতে পারে। আপনি আপত্তি করতে পারেন: ‘বিসমিল্লাহ্ বলে কেন শুরু করবো? হরি হরি বা হলি কাউ বললে কী সমস্যা?’
দুঃখিত। সম্ভাবনার হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম আমার পাঠক মুসলিম। আসল কথা হলো, আপনি তা-ই বলবেন যা বলতে আপনার জাতীয়তা সায় দেয়।

মোটকথা, ঠিক এ মুহূর্তে আপনি এবং আমি, আমরা দু’জন দরোজা ধাক্কা দিয়ে শুরুতেই বিষয়টির অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছি। আমরা বুঝতে পারছি— আমাদের বলা, ভাবা, করা সবকিছুতেই জাতীয়তা আছে। কাজেই জাতীয়তা বোঝার দরকারও আছে। একমত?


৩  জাতীয়তাবাদের অর্থ

দুনিয়ায় এখন সাত শো কোটি মানুষ। সবাই এক রকম নয়। একত্রেই বাস করছি এই উপগ্রহে, কিন্তু আমরা এক নই। আমাদের অনেক ধর্ম, বিভিন্ন বিশ্বাস, বিচিত্র মূল্যবোধ। আমরা সবাই সবার কথা বুঝি না, কারণ আমাদের ভাষা এক নয়। ইচ্ছেমতো যে-কোনো জায়গায় ঘরবাড়ি বেঁধে বসবাস শুরু করতে পারি না, কারণ সব দেশ স্বদেশ নয়। আমাদের গায়ের রঙ ভিন্ন ভিন্ন: কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ তামাটে। গঠনেও বিস্তর বৈচিত্র: কেউ খাটো, ফর্সা, চ্যাপ্টা নাক, পাতলা ঠোঁট, ছোট ছোট চোখ; আবার বহু মানুষ দীর্ঘাঙ্গী, খাড়া নাক, কোঁকড়ানো চুল। আমরা অনেক মানুষ, আমরা অনেক রকম।

এই সমস্ত ‘রকম’ এর মধ্য থেকে কী কী গুণে কারা কারা প্রায় এক রকম, তা দেখে এই ‘এক রকম’ লোকজনকে চিহ্নিত করা হয়। তারপর এদেরকে বলা হয় জাতি। জাতি থেকে এসেছে জাতীয়, জাতীয়তা, জাতীয়তাবাদ। জাতি অর্থ সামলক্ষণিক শ্রেণী, প্রায় এক রকম অনেক মানুষের সমষ্টি। আর জাতীয়তাবাদ মানে স্বজাতিপ্রেম, জাতির স্বরূপ ও স্বার্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা।


৪  জাতীয়তার তর্কিত উপাদান

নিগ্রো বললে আমরা এমন জাতির লোক বুঝি, যাদের গায়ের রঙ ডেকচির তলার মতো কুচকুচে কালো। যাদের গায়ের রঙ শ্বেত অর্থাৎ সাদা, তাদেরকে বলি শ্বেতাঙ্গ। এখানে তফাত তৈরি করা হয়েছে গায়ের রঙ দেখে। শুধু গায়ের রঙ কালো বলে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদেরকে শত শত বছর ধরে নির্যাতন করে আসছে। গাত্রবর্ণ দিয়ে মানুষকে দু’ ভাগে ভাগ করে তৈরি এই জাতীয়তার ইতিহাস কেবলই অত্যাচারের ইতিহাস। আমাদের জানা অতীতের মধ্যে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই অন্যায় রুখে দাঁড়ালেন প্রবলভাবে, স্থূল গাত্রবর্ণের অমানবিক ভেদরেখা তিনি মুছে দিতে সক্ষম হলেন। কৃষ্ণাঙ্গ বিলালকে সম্মানিত করে তিনি মনুষ্যত্বের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ইসলামের এই মহৎ শিক্ষার আলো ক্রমে ধর্মনির্বিশেষে মুসলিম জাহান ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীময়। ফলে কমে আসছে বর্ণবাদ। এ উত্তরণের আধুনিক প্রান্তে এসে অবশেষে একজন কৃষ্ণাঙ্গ আজ মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি একজন কালো পুরুষ ও এক সাদা নারীর শঙ্কর সন্তান।

এভাবে, ইংরেজ জাতি বলে আমরা সেই জাতিকে বুঝাই, যারা ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। এখানে জাতি গঠনের উপাদান হয়েছে ভাষা। হয়েছে মানে ধরে নেয়া হয়েছে, যদিও তা প্রকৃত অর্থে পৃথক কোনো জাতি বুঝায় না। বুঝায় ইংরেজিভাষী জনগোষ্ঠি। তাত্ত্বিকভাবে ভাষা দিয়ে জাতিগঠনের চেষ্টা ব্যর্থ চেষ্টা এবং যৌক্তিক ভুল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জন্মসূত্রে এই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার গর্বিত মালিক। কিন্তু তত্ত্ব হিসেবে আমরা এ জাতীয়তা মানি না। কারণ স্রেফ ভাষার একতা অনেককে এক করে ধরে রাখতে পারে না। কীভাবে -- উদাহরণ দিই।

জয় গোস্বামী কলকাতাবাসী। আমার মতো তিনিও বাংলায় লেখেন, বাংলা বলেন। ভাষার ঐক্যে আমরা দু’জনই এক, বাঙালি। ভাষার এই মিল মান্য বটে, তবে এই মিল দিয়েই সাময়িক জনমিল ঘটলেও স্থায়ী মনোমিলের যুক্তি মেলে না। ভাষা এক বলেই তাই তাঁকে আমার জাতীয় ভাই, বন্ধু বা আপনজন বলে মেনে নিতে পারি না, যদিও মানুষ হিসেবে তিনি আমার কাছের এবং সেটি অন্য বিবেচনা। তাঁকে স্বজাতীয় স্বীকার করতে না-পারার কারণ অনেক। আমরা একে অপরের কাছে যেতে পাসপোর্ট লাগবে। রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে খেতে বসে আমি যদি গোমাংসের অর্ডার দিই, তাহলে গোস্বামী টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে বেসিনে হড়হড় করে বমি করবেন। তিনি আমাকে হুইস্কি অফার করলে আমি আস্তাগফিরুল্লাহ বলে মুখ ফিরিয়ে নেবো। এভাবে চলাফেরা, নৈতিকতা, বোধ-বিশ্বাস সবকিছুতেই আমরা দু’জন দুই মেরুর। আমাদের মুখের ভাষায় মিল, কিন্তু বুকের ভাষায় মিল নেই। সম্পর্ক মূলত হৃদয়ঘটিত বলে, মুখের মিলে শেষ পর্যন্ত জীবনে জীবন মেলানো যায় না। বৈপরিত্যটা অন্তর্গত, আর ঐক্য বাইরের। ভেতর-বাহিরের দ্বন্দ্বে ভেতরে ভেতরে আমরা বন্ধ হয়ে থাকি। সহাবস্থান তাই সহবোধ দেয় না। এ আড়ষ্টতা নিয়ে হৃদ্যতা গড়ে ওঠা কি সহজ? কীভাবে আমি ও তিনি জাতি-বিবেচনায় এক হবো?

একটু আগে যে- রাজনৈতিক দলটির উদাহরণ দিলাম, তারা চোখ-কান বন্ধ করে ‘বাঙালি বাঙালি’ বলে চিৎকার করেই যাচ্ছে। দুনিয়াজুড়ে ভারতের নাগরিককে ভারতীয়, রাশিয়ার রুশ, ইংল্যান্ডের ইংলিশ, মিশরের মিশরি, পাকিস্তানের নাগরিককে পাকিস্তানি বলা হচ্ছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের মুখে কখনোই ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি শোনা যায় না। কারণ ‘তালাক’ বললে যেমন স্ত্রীবিয়োগ ঘটে, তেমনি বাংলাদেশি বললে আওয়ামী লীগত্ব নষ্ট হয়।

জাতীয়তা নির্ণয়ের তৃতীয় উপাদান জমির চৌহদ্দি, অর্থাৎ ভৌগোলিক সীমানা। এ নিয়ে বেশি কিছু বলবার নেই। কারণ জমি মেপে মানুষের প্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করবার চেষ্টা ধানগাছ চিরে তক্তা বানাবার মতোই হাস্যকর। যে- ভূমিতে ভূমিষ্ঠ হয়েছি, সে যদি হয় জন্মভূমি, আর জন্মভূমি হবার কারণেই বিশেষ ভূমির প্রতি আমার যদি বিশেষ টান বোধ করবার কথা থাকে, তবে তো আঁতুড়ঘরের ওই স্থানটুকু বড়ই সঙ্কীর্ণ! এইটুকুন জায়গাকে দর্শন ‘দেশ’ বলতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান তা মানবে না। সে তর্ক আপাতত থাক, আশু ঝামেলা হলো, আমি কেন আমার কয়েক বর্গ ফুটের জন্মস্থানকে না বুঝিয়ে ‘জন্মভূমি’ বলে কয়েক হাজার বর্গ মাইল বুঝাচ্ছি? কোন্ কারণের আকর্ষণে ক্ষুদ্র ভূ-টুকরো মাইল মাইল ছড়িয়ে গেলো? কারণ কোনো একটা আছে। সেটাই দরকার। কারণ ওই কারণটা দিয়ে একইভাবে আমি আমার হাজার মাইল আয়তনের জন্মদেশের সীমানাকে পৃথিবীর প্রান্তসীমা অবধি ছড়িয়ে নেবো। ঠিক তখন আরো চমৎকার একটা কারণের জন্ম হবে, যার সাহায্যে আমি চমৎকৃত হয়ে আবিষ্কার করবো যে, আমার জন্মদেশটা আসলে বিশ্বদেশ, আর আমি একজন বিশ্বনাগরিক।

বস্তুত, বিশ্বাস ও জীবনধারার দুস্তর দূরত্ব নিয়ে শারীরিকভাবে কেউ কাছে থাকলেই বা নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখার ভেতরে অবস্থান করলেই সে আমার সঙ্গে একই জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে, এ কোনো যুক্তির কথা নয় বরং নিছক আবেগ। এ আবেগ বাস্তবতা উপেক্ষা করে নিজের দেশকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দেশ বলে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে এবং দেশ ও জাতির প্রতি বিদ্বেষ সঞ্চার করে। কবি বলেছিলেন, আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়। কিন্তু নিজেকে বড় ও গৌরবান্বিত ভাবার মধ্যে যে এক ভীষণ রকম স্বাদ আছে, তা সবাই জানে বলে কাউকে বলতে হয় না। জাতীয়তাবাদীরা সেরা জাতি, তাদের নিজের দেশ ‘সকল দেশের সেরা’। হিটলার এটা খুব চমৎকার বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জার্মান রক্ত হলো পৃথিবীর সবচে’ অভিজাত রক্ত। চেম্বারলেনের কথায়, যা-কিছু ভালো তা অবশ্যই জার্মান, অ-জার্মান মানেই খারাপ। কপালে খারাপি ছিলো জার্মানদের, তাই খারাপদের হাতে খুব খারাপভাবেই তারা মার খেয়েছিলো। ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ আসলে দৈশিক অহংবোধ। সাম্রাজ্যবাদীরা আরবদের মাথার ভেতর এই অহমিকা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। ফলে তারা ভাবলো, ইসলামের জন্ম হলো আমাদের দেশে, ইসলামের নবী-কিতাব আমাদের ভাষায়, অথচ ইসলামী খিলাফাতের কেন্দ্র আরবের বাইরে অনারব কনস্ট্যান্টিনোপলে, এটা তো অপমানজনক। তারা তাদের জাতীয়তাবাদ নিয়ে হামলা করলো উসমানী খিলাফাতে, খিলাফাত গেলো ভেঙে। সেই সঙ্গে আদর্শবাদী মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের শক্তিও খানখান হয়ে গেলো। সাম্রাজ্যবাদীরা চেপে বসতে লাগলো মুসলিম দেশগুলোর ঘাড়ের ওপর। আমাদের দেশেও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ আমদানি হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এ নিয়ে গর্বের সঙ্গে রাজনীতি করছে।

কিন্তু আসল কথা হলো, নাগরিকত্ব বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় আর জাতীয়তা আদৌ এক জিনিস নয়। মতি মিয়া রতনপুর গ্রামে বাস করেন – এখানে রতনপুর যেমন তাঁর গ্রামের ঠিকানা; তেমনি তিনি বাংলাদেশে বসবাস করেন, এর অর্থ হলো বাংলাদেশ তাঁর রাষ্ট্রীয় ঠিকানা। মতি মিয়া বিদেশ গেলে এই ঠিকানা কাজে লাগবে। দেশে যেহেতু বিদেশিরা বেড়াতে বা কাজ করতে আসে, তাই মাঝেমধ্যে দেশেও তাঁকে বলতে বা লিখতে হতে পারে যে তিনি একজন বাংলাদেশি। এই দেশীয় পরিচয় আর স্বকীয় জাতীয়তা এক জিনিস নয়। সাধারণ বুদ্ধিতেই দু’য়ের পার্থক্য বুঝা যায়। কিন্তু অসৎ রাজনীতিবিদরা দলীয় সুবিধা নিতে সহজ সরল জনগণকে ভুল বুঝাতে চেষ্টা করেন। তাঁরা জনগণের স্বকীয় সংস্কৃতি, গৌরবময় ঐতিহ্য, পররাষ্ট্রের নিগ্রহের প্রতিশোধ, দেশপ্রেম ইত্যাদি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক আবেগকে উস্কে দিয়ে দেশীয় পরিচয়ই মানুষের মৌলিক পরিচয় এমন ধারণা জনমানসে প্রতিষ্ঠা করতে চান। এ চেষ্টা অতীতে যেমন ছিলো, আজও আছে। ভারতে হিন্দু কর্তৃক নির্যাতিত সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্যে নিরাপদ ও স্বায়ত্তশাসিত পৃথক ভূখণ্ডের দাবিতে স্বাধীন পাকিস্তান আন্দোলনের সময় মুসলিম জনগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রবলভাবে এই চেষ্টা শুরু হয়েছিলো। সে দেশে ১৮৮৫ ঈসায়ীতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকারেরই সরাসরি উদ্যোগে অ্যালান অকটেভিয়ান হিউমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় কংগ্রেস, যা পরে দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। একটি ধারা ছিলো যথারীতি ব্রিটিশ সমর্থক। অন্যটি ছিলো উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা লালা লাজপৎ রাই-এর অধীনে – গোঁড়া, সাম্প্রদায়িক, মুসলিমবিদ্বেষী এবং ভারতকে নিরঙ্কুশ রামরাজ্য বানানোর যুদ্ধে শপথবদ্ধ। অতএব কোনো দিক থেকেই ভারতের নির্যাতিত সংখ্যালঘু মুসলিমদের জাতীয় অস্তিত্ব ও স্বার্থের সঙ্গে কংগ্রেসের কোনো সুসম্পর্ক থাকার কথা ছিলো না। কিন্তু অতি কৌশলে এ দলটি ইসলামী খিলাফা ও মুসলিম উম্মাহ্-চেতনায় উজ্জীবিত স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করতে সমর্থ হয় (পরে অবশ্য অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়, সেটি এখানে আলোচ্য নয়) এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে কতিপয় মুসলিম রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃস্থানীয় লোক এদের চক্রান্তের শিকার হয়ে হিন্দু-মুসলিম মিলনের ফাঁকা বুলি আওড়াতে শুরু করেন। সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দূষিত ধারণাকে ইসলামীকরণ করবার চেষ্টা করেন। তাঁরা বলেন: কোনো জনগোষ্ঠীর জাতীয়তা নির্ণয়ের মাপকাঠি ধর্ম নয় বরং ভৌগোলিক সীমারেখা। তাই ভারতের হিন্দু-মুসলিম ধর্ম-সংস্কৃতিনির্বিশেষে আমরা সবাই এক জাতি। তাঁরা এ ধারণার নাম দেন ‘মুত্তাহিদা ক্বাওমিয়্যাত’ বা ‘একজাতিতত্ত্ব’। পরিস্থিতির প্রয়োজনে অমুসলিমদের সঙ্গে মুসলিমদের সাময়িক রাজনৈতিক চুক্তির কথা আর হিন্দু-মুসলিম মিলে একই জাতিসত্তা গঠনের কথা এক কথা নয়। এ দ্বিতীয় কথাটি নিয়েই আমাদের কথকতা। কেননা তা সরাসরি কুরআন-হাদীসবিরোধী, তবু খামাখাই কেউ কেউ এসব স্পষ্ট জাহিলি জাতীয়তা-আঞ্চলিকতার ফ্যাসাদকে ইসলামসিদ্ধ প্রমাণ করতে চেষ্টা করছেন। অথচ কুরআন বলছে, বংশীয় আভিজাত্য, গোত্রপ্রীতি, ভাষাগত বিভক্তি, আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ – এ সবই যুলম। হাদীসের ভাষায় এগুলো জাহিলিয়্যাত। তাত্ত্বিক আলিমদের মতে শয়তানি চিন্তা। সাম্প্রতিক আলিম লেখক সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী জাতীয়তাবাদকে ‘জাহিলি যুগের ভ্রান্ত ধর্ম’-এর সঙ্গে তুলনা করে জাতীয়তাবাদীদেরকে সে ধর্মের ‘পূজারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। মাফ করবেন, অনিচ্ছাসত্ত্বেও এ উদ্ধৃতিটুকু:

“এই উদার প্রগতির যুগেও এমন অনেক ধর্মের সাক্ষাত মেলে যেসব ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস ও শিক্ষামালা খুবই হাস্যকর যা তার অনুসারীদের নির্বোধ ও চেতনাহীন পশুর মত জোয়ালে বেঁধে রেখেছে এবং তাদেরকে নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা ও চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করার অনুমতি দেয় না। এরপর এমন কিছু ধর্ম ও বিধি-ব্যবস্থাও আছে যেগুলো ধর্ম নামে কথিত হবার উপযোগী নয় বটে, কিন্তু আপন নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার আওতায়, স্বীয় অপরিসীম শক্তি ও সরকারের মধ্যে এবং আপন অনুসারীদের অন্ধ আনুগত্য ও ভক্তির আবেগাতিশয্যে প্রাচীন ধর্মগুলো থেকে কোনক্রমেই কম নয়। এগুলো সেইসব রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক দর্শন যেগুলোর ওপর আজকে মানুষ ঠিক তেমনি বিশ্বাস পোষণ করছে যেমনটি আগে বিভিন্ন ধর্ম ও জীবনদর্শনের ওপর পোষণ করতো। এগুলো হচ্ছে এ যুগের জাতীয়তাবাদ, ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজবাদ বা সমাজতন্ত্র সমূহবাদ ইত্যাদি। এসব নতুন ধর্ম নিজেদের একচোখা নীতি, সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও হৃদয়হীনতার ক্ষেত্রে প্রাচীন জাহিলী যুগের বিভিন্ন ধর্ম ও মাযহাবের চাইতেও এক ডিগ্রী বেশি।”
——— আবুল হাসান আলী নদভী; ‘মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?’; মুহাম্মদ ব্রাদার্স, ঢাকা; ২০০৪; পৃষ্ঠা ৩১৫।

আমাদের আলোচিত তিনটি ছাড়া জাতীয়তা নির্ধারণের উপাদান হিসেবে নৃতাত্ত্বিক গঠন ও ব্যবহারিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করা হয়ে থাকে, তবে তা আলোচনার পূর্ণতার উদ্দেশ্যেই। আদতে এ দু’টো বিবেচ্য হিসেবে অপেক্ষাকৃত অধিকতর বিস্তৃত ও জটিল এবং গুরুত্বের দিক থেকে গৌণ। তাই আমরা এখন ফিরে যাবো আলোচনার মূলে এবং দেখবো জাতীয়তার উপাদান হিসেবে কুরআন কোন্ মৌলিক বিষয় ও বৈশিষ্ট্য স্থির করেছে, তাঁর অনুসারীদের কাছে এ সংক্রান্ত চিন্তার কী নীতি ও পদ্ধতি উপস্থাপন করেছে এবং রাসূল সা. তাঁর একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবী ও তাঁর প্রিয় উম্মাহকে কী শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন।


৫  ইসলামে জাতীয়তার উপাদান ও ধরন

ইসলাম মানে শান্তির জন্যে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ, অস্তিত্ব-চেতনা-সম্পদ সবকিছু নিয়ে আত্মসমর্পণ। সর্বান্তকরণে মেনে নেয়া যে আল্লাহ্ই একমাত্র মা’বূদ ও বিধানদাতা। যে- ব্যক্তি আল্লাহ্কে একমাত্র স্রষ্টা ও উপাস্য বলে স্বীকার করলো, কিন্তু তাঁকে সর্বোচ্চ হুকুমকর্তা বলে মেনে নিতে রাজি হলো না– সে মুয়াহহিদ (একেশ্বরবাদী) হতে পারে, কিন্তু মুসলিম নয়। প্রকৃত মুসলিম তার জীবন-মরণের সকল বিষয়ে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে অবিচল। এই অবিচল বিশ্বাসী ও একনিষ্ঠ আদর্শবান মানুষদেরই সম্মিলিত নাম ‘মুসলিম উম্মাহ্’ বা মুসলমান জাতি। এরা পরস্পর ভাই ভাই। এদের ভ্রাতৃত্ব রক্তসম্পর্কের চে’ মযবুত, আত্মীয়তা-সম্পর্কের চে’ ঘনিষ্ঠ। এদের বিশ্বাস, আদর্শ, ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতায় তৈরি জাতিসত্তাগত বাঁধন চির-অটুট, অবিচ্ছেদ্য। রাসূল সা. বলেছেন: সমস্ত মুসলিম একটি দেহের মতো, এর যে- কোনো অঙ্গে আঘাত লাগলে সারা দেহই ব্যথিত হয়। বিভিন্ন দেশ-ভাষা-বর্ণ-গোত্র-সংস্কৃতির অসংখ্য মানুষ ইসলামের ছায়াতলে এসে এই জাতিসত্তায় মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। প্রাণখোলা আল্লাহ্ভক্তি ও উদার মানবপ্রেমের বন্যায় খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিলো জাহিলী বংশগরিমা ও আঞ্চলিক বিভক্তি। আল-উখুয়্যাহ ফিল্লাহ-এর মহা আহবানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর সৈনিক হিসেবে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন কুরাইশ বংশের হামযা, গিফারী গোত্রের আবূ যার, পারস্যদেশের সালমান, হাবশার বিলাল ও রোমের সুহাইব প্রমুখ দূরত্বজয়ী মানুষেরা। বস্তুত মানুষের জন্যে বিশ্বাস ও আদর্শের চে’ শক্ত আর কোনো ঐক্যসূত্র যে নেই, ইসলাম এর বাস্তব প্রমাণ ও বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মদীনার মুসলিমগণ তাঁদের দূরাগত বিদেশি ভাইদেরকে নিজেদের সবকিছুতে সমান মালিকানা উপহার দিয়ে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। মহানবী সা. ও তাঁর সাহাবা কিরাম কুরআনের বৈশ্বিক চেতনা অনুযায়ী মুসলিম জাতির অধিবাসকে কোনো স্থির-নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমিত করেন নি, কখনো আঞ্চলিক বিভক্তি স্বীকার করেন নি। এক দেহের মতো এ জাতিকে তাঁরা এক দেহের মতোই অবিভাজ্য রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। দিন দিন নতুন অঞ্চল বিজিত হচ্ছিলো এবং ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিলো নববী রাষ্ট্র, একসময় জাযিরাতুল আরব ছাড়িয়ে পারস্য, আফ্রিকা, রোমসহ আধা দুনিয়া মুসলিমদের পদানত হয়। তখনও রাষ্ট্র একটাই ছিলো– অর্ধ জাহান নিয়ে এক ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামের আদর্শিক দার্শনিক তাৎপর্য সম্পর্কে যাঁদের ধারণা আছে, তাঁরা বুঝতে পারেন যে পুরো দুনিয়া মুসলিম করায়ত্ত হলেও রাষ্ট্র একটাই থাকতো– এক দুনিয়া, এক জাতি, এক দেশ। আজকের পৃথিবীতে এতো মুসলিম, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ নববী আদর্শ থেকে বিচ্যূত, ফলে শতধাবিভক্ত। কুরআনের পরিবর্তে আজ আমাদের মাথার ভেতরে ভূগোল ঢুকে পড়েছে, সেই ভূগোল দিয়ে আমরা কেবলই পরস্পরের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর নির্মাণ করছি।


৬  কুরআনে মুসলিম জাতীয়তানীতি ও সম্পর্কসূত্র

আমাদের সার্বভৌম প্রভু মহান আল্লাহ্ একমাত্র ঈমানকেই আমাদের পারস্পরিক সামাজিক ও জাতীয় যাবতীয় সম্পর্কের সূত্র বলে আমাদেরকে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা এ সতর্কবার্তা ভুলে গিয়ে বংশ ও আঞ্চলিকতা ইত্যাদি মনগড়া সম্প্রীতি-নীতির অজুহাতে আল্লাহর দ্বীনের শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তারা যালিম বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ্ বলছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতা যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে শ্রেয় জ্ঞান করে, তবে উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে, তাহারাই যালিম।‍” (কুরআন, ৯:২৩)।

বিশ্বব্যাপী আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের জন্যেই মুসলিম উম্মাহর উদ্ভব। এই উম্মাহর লক্ষ্য যেমন বড়, তেমনি এর আদর্শ, অবস্থান ও কর্মনীতিও সকল দুর্বলতা, নেতিবাচকতা, সঙ্কীর্ণতা ও ক্ষুদ্রতার উর্ধে। ভাষার পার্থক্য তাদেরকে বিভক্ত করে না। অবস্থানের দূরত্ব তাদের ভালোবাসার কাছে পরাস্ত হয়। বর্ণের বৈচিত্র বা গঠনের তারতম্য তাদের ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বে কোনো খাদ তৈরি করতে পারে না। হাজার হাজার মাইল দূরের এক সাধারণ মুসলিম প্রজাকে সামান্য অপমান করায় মুসলিম খলীফা তাই সমগ্র খ্রিস্টসাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কেননা যে- মুসলিম, সে আমার ভাই; সে কোথায় থাকে, কোন্ ভাষায় কথা বলে, তাতে কিছুই যায় আসে না। সে আমার প্রাণের সুহৃদ, কারণ সে মুসলিম। যে- মুসলিম, নিগ্রো হোক স্প্যানিশ হোক আরবী হোক, সে আমার সহোদরের চে’ নিকটজন। সে আমার অনন্তকালের আত্মার আত্মীয়। এই তো ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। অথচ হে মুসলিম, হে আমার আত্মভোলা ভাই, হে শান্তি-সম্প্রীতির পথিকৃৎ, কোথায় তুমি আজ? আর কোথায় তোমার আত্মপরিচয়ের সোনালি ইতিহাস?

আল্লাহর চোখে আমাদের সবচে’ বড় পরিচয় তো এটাই যে আমরা তাঁর বান্দা। আল্লাহ্ আমাদের একমাত্র ইলাহ, মা’বূদ ও হুকুমকর্তা। হযরত মুহাম্মদ সা. আমাদের একমাত্র মৌলিক শিক্ষক। এসব কথা আন্তরিক ও কার্যকরভাবে নির্দ্বিধায় স্বচ্ছন্দে মেনে নিয়েই তো আমরা মুমিন ও মুসলিম হয়েছি। তাই ঈমানের দাবি হলো, আমাদের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান, সব প্রশ্নের উত্তর এবং সমস্ত চাহিদার সম্পূরক আমরা কুরআন এবং সুন্নাহ্ থেকেই গ্রহণ করবো। তা না করে নিজের খেয়ালখুশিমতো কিছু বিষয় শরীয়া থেকে আর কিছু নিজের বুদ্ধি ও রুচির সিদ্ধান্ত অথবা বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠির মতামত থেকে বেছে নেয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। এমনটি করলে আমরা আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ ‘তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর’ (২:২০৭) এর অমান্যকারী, সুবিধাবাদী এবং আল্লাহর একক আনুগত্য ও সার্বভৌমত্বে অংশী সাব্যস্তকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পরিণামে নিগৃহীত হবো। অতএব আমাদের সামাজিক ভ্রাতৃবন্ধনের সূত্র কী, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের নির্ণায়ক কোন্ জিনিস, কীসের ভিত্তিতে আমরা পরস্পর প্রীতিবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি স্থাপন করে ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ হিসেবে শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে জীবনযাপন করতে সক্ষম হবো – এসব প্রশ্নের উত্তরও কুরআন-সুন্নাহ্ থেকেই খুঁজে নিতে হবে।

আগের আয়াতে আমরা দেখেছি যে, ঈমানী মিল ছাড়া আপন পিতা বা সহোদর ভাইকেও অন্তরঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করতে বারণ করা হয়েছে। এখন আমরা যা পাঠ করবো, তাতে ঈমান ও সদাচার ছাড়া বৃহৎ জাতিসত্তার সদস্য দূরের কথা, ক্ষুদ্র পরিবারেরও অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

প্রেক্ষাপট হযরত নূহ আ. এর সময়কার মহাপ্লাবন। দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে ধ্বংসের ঢেউ। গুটিকয়েক ঈমানদারকে নিয়ে নূহ কিশতিতে উঠেছেন। সম্মুখে তাঁর ছেলে ডুবে যাচ্ছে। তিনি ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে ডাকছেন– “ইরকাব মাআনা, হে প্রিয় সন্তান! জলদি উঠে এসো আমাদের সঙ্গে..। তুমি তো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছো.. এসো... এসো....!” সেই সঙ্গে নিজের ছেলেকে বাঁচানোর জন্যে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আসুন, দৃশ্যটা সরাসরি দেখি:

“নূহ তাহার প্রতিপালককে সম্বোধন করিয়া বলিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্র“তি সত্য; আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।
তিনি বলিলেন, হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ন। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করিও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিতেছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও।” (কুরআন, ১১:৪৫-৪৬)।

হযরত নূহ বললেন তাঁর ছেলে তাঁর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। জবাবে আল্লাহ্ বললেন, তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এটা আল্লাহর ফায়সালা। এটাই ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সূত্র হিসেবে পরিবার, বংশ, গোত্র, বর্ণ, ভাষা, দৈহিক গঠন, সহাবস্থান ও ভৌগোলিক সীমারেখা ইত্যাদির কোনো মূল্য নেই। ইসলামে সম্পর্কের ভিত্তি ও ঐক্যের একমাত্র সূত্র হলো আদর্শ। শুধুই ঈমান ও তাক্বওয়া।

মুশরিক ও দুর্বৃত্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে কোনো মুসলিমের ভ্রাতৃসম্পর্ক হতে পারে না, কেননা তারা আল্লাহর দ্বীনের ও তার অনুসারীদের কল্যাণকামী নয়। ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ শ্লোগান অথবা এ গান ‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ নিছকই অজ্ঞতাপূর্ণ আবেগ। জ্ঞানীদের জন্যে আল্লাহ্ বিধান বিবৃত করেছেন যে, ভাই ভাই সম্পর্ক কেবল ঈমান ও সদাচারের ভিত্তিতেই হতে পারে:

“তাহারা কোন মুমিনের সঙ্গে আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না, তাহারাই সীমালঙ্ঘনকারী। অতঃপর তাহারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তাহারা তোমাদের দ্বীনী ভাই; জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে আমি নিদর্শন স্পষ্টরূপে বিবৃত করি।” (কুরআন, ৯:১০-১১)
“তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদেরকে এমনি ছাড়িয়া দেওয়া হইবে যখন পর্যন্ত আল্লাহ্ না প্রকাশ করেন তোমাদের মধ্যে কাহারা মুজাহিদ এবং কাহারা আল্লাহ্, তাঁহার রাসূল ও মুমিনগণ ব্যতিত অন্য কাহাকেও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করে নাই?” (কুরআন, ৯:১৬)

ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ হিন্দু-খ্রিস্টান-ইহূদী-বৌদ্ধ-নাস্তিক সবার সঙ্গেই সৌহার্দপূর্ণ বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের প্রেরণা দেয়। ঔপনিবেশিক ভারতের জাতীয়তাবাদীরাও হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে স্বাধীনতা আন্দোলন না করলে মুসলিম জনগোষ্ঠির ভাগ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কাবার্তা উচ্চারণ করে মুসলিম স্বায়ত্তশাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ আল্লাহ্ বলছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না, তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেহ তাহাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে সে তাহাদেরই একজন হইবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।”

“এবং যাহাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রহিয়াছে তুমি তাহাদেরকে সত্বর তাহাদের সঙ্গে মিলিত হইতে দেখিবে এই বলিয়া, ‘আমাদের আশঙ্কা হয় আমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটিবে।’ ” (কুরআন, ৫:৫১-৫২)

কংগ্রেসপন্থী মুসলিমরা পৌত্তলিকদের ঐক্য ও সম্প্রীতি-প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ আমাদেরকে আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম ও তাঁর উত্তরসূরীদের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন, যিনি পৌত্তলিকদেরকে বলেছিলেন, কাফারনা বিকুম– আমরা তোমাদেরকে মানি না।

“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাহার অনুসারীদের মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ। যখন তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাহার ইবাদত কর তাহার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হইল শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য; যদি না তোমরা এক আল্লাহ্তে ঈমান আন।’ ” (কুরআন, ৬০:৪)

সর্বোপরি কাফির-মুশরিক-মূর্তিপূজকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন ইসলামের চেতনা ও ঈমানের দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী, জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের নিয়মেই যা করতে বাধ্য হয়:

“তুমি পাইবে না আল্লাহ্ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়, যাহারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে– হউক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাহাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা ইহাদের জ্ঞাতি-গোত্র।” (কুরআন, ৫৮:২২)।


৭  হাদীসের ভাষায় জাতীয়তা মূর্খতা

বাংলাদেশের আধুনিক জাতীয়তাবাদীদের কাছে ধর্ম অরাজনৈতিক এবং একটি গৌণ বিষয়। তাই ধর্ম যদি কেউ মানতে চায়, তবে ব্যক্তিগতভাবে মানবে। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ধর্মের চে’ বড়। আর ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের সংগ্রামী জাতীয়তাবাদীরা জাতীয়তাবাদী চক্রান্তের গায়ে ধর্মীয় পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, মুসলিমদের ধর্ম ও তাহযীব রক্ষা করতে হলে ইংরেজকে বিতাড়িত করতে হবে; এবং ইংরেজকে বিতাড়িত করতে হলে হিন্দুদের সাহায্য নিতে হবে, তাদের সঙ্গে এক হয়ে সংগ্রাম করতে হবে, কেননা শুধু মুসলিমদের পক্ষে ইংরেজ খেদানো সম্ভব নয়।

অথচ কাফিরদের সাহায্য গ্রহণ হারাম। সারা দুনিয়ার প্রাজ্ঞ ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে এমনকী অন্য কোনো শত্রুর মুকাবিলায় শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যেও কাফিরদের সাহায্য নেয়া বৈধ নয়। শায়খ আবদুল আযীয বিন আবদুল্লাহ বিন বায তাঁর “নাক্বদুল ক্বাউমিয়্যাতিল আরাবিয়্যাতি আলা যূ-ইল ইসলামি ওয়াল ওয়াক্বি” গ্রন্থে (পিডিএফ, পৃষ্ঠা ৬৩) লিখেছেন:

“মুসলিমদের জন্যে কাফিরদের বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে ওদের সাহায্য গ্রহণ অবৈধ। কেননা ওরাও শত্রু এবং সুযোগ পেলে ওরাও বড় রকমের ক্ষতি করতে পারে। আল্লাহ্ কাফিরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হারাম করেছেন এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, যারা ওদের বন্ধুজ্ঞান করবে তারা ওদেরই অন্তর্ভুক্ত এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, এরা সবাই যালিম। ইতোপূর্বে বর্ণিত স্পষ্ট আয়াতসমূহে এর উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া মুসলিম শরীফে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের দিকে রওনা হলেন। তিনি যখন ‘হাররা আল-ওয়াবরা’তে ছিলেন তখন একটি লোক সেখানে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়। লোকটির সাহস ও বীরত্বের কথা সবাই বলাবলি করতো। রাসূলের সঙ্গীরা তাই লোকটিকে দেখে অত্যন্ত খুশি। কিন্তু সে রাসূলের সঙ্গে মিলিত হয়ে যখন তাঁকে বলল, “আমি আপনার সহযাত্রী হয়ে আপনার কষ্টের অংশীদার হতে এসেছি।” তখন তিনি তাকে বললেন : “তুমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছো?” লোকটি বললো, “না”। তিনি বললেন: “তাহলে তুমি ফিরে যেতে পারো, আমি কোনো মুশরিকের সাহায্য নেবো না।” লোকটি চলে গেলো। তারপর আমরা যখন ‘আশ-শাজারা’তে পৌঁছি, তখন লোকটি আবার এসে পূর্বের ন্যায় একই কথা বললো। রাসূল সা.-ও তাকে একই জবাব দিলেন। অর্থাৎ তিনি ‘না’ বলে দিলেন। তিনি বললেন, “তুমি ফিরে যাও, আমি কোনো মুশরিকের সাহায্য নেবো না।’ লোকটি ফিরে গেলো। কিন্তু ‘আল-বীরা’ নামক স্থানে সে আবার এলো। রাসূল সা. তাকে এবারও প্রথমবারের মতোই বললেন: “তুমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছো?” লোকটি এবার বললো, ‘হ্যাঁ’। তখন আল্লাহর রাসূল সা. তাকে বললেন: “তাহলে চলো।” এই মহান হাদীস আমাদেরকে মুশরিকদের সাহায্য বর্জন এবং কেবল মুমিনদের সাহায্য গ্রহণ করার পথনির্দেশ দেয়।”

শায়খ বিন বায উক্ত গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায় জাতীয়তাবাদকে ‘প্রতারণা’ আখ্যায়িত করে লিখেছেন:
“ইসলামের নীতি অনুযায়ী আরব কিংবা অন্য যে- কোনো জাতীয়তাবাদ প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মহাপাপ। এই প্রচার মূলত ইসলাম ও মুসলিমদের জন্যে একটি সুস্পষ্ট প্রতারণা।”

শাইখুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া (র) একটি বিশুদ্ধ হাদীসের বরাত দিয়ে জাতীয়তাবাদকে “জাহিলিয়্যাত” বলেছেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “মাজমূ’ আল-ফাতাওয়া” (২৮:৩২৮)-তে লিখেছেন:
“ইসলাম ও কুরআনের আহ্বান-বহির্ভূত সবকিছুই- যেমন বংশ, দেশ, জাতি, মাযহাব, তরীকা ইত্যাদি জাহিলিয়্যাতেরই এক-একটি নিদর্শন। একবার এক আনসার ও এক মুহাজিরের মধ্যে বিবাদ লেগে গেলে উভয়ে “হে আনসারগণ ও হে মুহাজিরগণ” সম্বোধনে যার যার সম্প্রদায়কে সাহায্যের জন্যে ডাক দেয়। তখন রাসূল সা. ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন:

'‘আ-বিদা’ওয়াল জাহিলিয়্যাহ্, ওয়া আনা বাইনা আযহারিকুম?’– “জাহিলিয়্যাতের দিকে আহ্বান জানানো হচ্ছে! অথচ আমি তোমাদের মাঝেই রয়েছি।'’ এই ঘটনায় তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।”

আবূ দাঊদ ও ইবন মাজা শরীফে হযরত হারিস আশ্’আরী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল সা. বলেছেন:
“আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজ করতে বলছি, আল্লাহ্ আমাকে সেগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। কাজগুলো হলো: শ্রবণ ও আনুগত্য, জিহাদ, হিযরত ও জামায়াত তথা সংঘবদ্ধভাবে থাকা (পৃথক না হওয়া)। যে- ব্যক্তি সংঘবদ্ধ জীবন থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে সে তার গলা থেকে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলবে, যতক্ষণ যতক্ষণ না আবার ফিরে আসে। আর যে- ব্যক্তি জাহিলিয়্যাতের মতাদর্শ গ্রহণের আহবান জানাবে সে জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত হবে।” একজন প্রশ্ন করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! যদি সে নামায-রোযা করে তবুও?” তিনি বললেন: ‘ওয়া ইন সাল্লা ওয়া সামা ওয়া যায়িমা আন্নাহু মুসলিম’ – “হ্যাঁ, যদিও সে নামায-রোযা করে এবং মনে করে যে, সে মুসলিম।”


৮  উম্মাহর ঐক্যে ভাঙন গুরুতর শাস্তিযোগ্য

মুসলিম জাতির প্রবর্তক ইবরাহীম আ. ও প্রতিষ্ঠাতা মহানবী মুহাম্মদ সা. ছিলেন ইনসানিয়্যাত ও উবূদিয়্যাতের সার্বিক ও সার্বক্ষণিক শিক্ষক। বিশেষত আমাদের মহানবী কী গভীর যত্ন, প্রচণ্ড শ্রম ও প্রগাঢ় মমতায় তিল তিল করে একটি জাতিকে আল্লাহর ইচ্ছার রঙে রঙিন করে গড়ে তুলেছিলেন, হাদীস ও ইতিহাসের হাজার হাজার পাতায় তা সবিস্তারে বিধৃত আছে। এ উম্মাহর ঐক্য রক্ষার্থে কুরআনে যেমন আল্লাহর রজ্জুকে মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, রাসূলও তেমনি যে-কোনো উপায়ে জাতীয় ঐক্যে অনৈক্য ও ভাঙন সৃষ্টিকে গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ সাব্যস্ত করে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আল্লাহ্ বলছেন:

“তোমরা তাহাদের মত হইও না, যাহারা তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসিবার পর বিচ্ছিন্ন হইয়াছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করিয়াছে। তাহাদের জন্য মহাশাস্তি রহিয়াছে।” (কুরআন, ৩:১০৫)।

সহীহ মুসলিমে উদ্ধৃত, রাসূল সা. বলেছেন: “মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে যদি কেউ ভাঙন সৃষ্টি করতে চায়, তবে তাকে তরবারি দ্বারা শায়েস্তা করো।”

৯  উপসংহার

মানুষ একই সঙ্গে অনেক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। মানুষকে যদি জাতিতে জাতিতে ভাগ করতে হয়, তবে তা করা উচিত তার প্রধান স্বকীয়তার ভিত্তিতেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের প্রধান স্বকীয়তা তার ঈমান, অতএব আল্লাহর বান্দাদের জন্যে ঈমানই তাদের আত্মপরিচয়ের মূল উৎস। পূর্ণ ঈমানই তাদের মানবজন্মের ইহ-পরকালীন সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি। ঈমান ও ঈমানী চরিত্রের উৎকর্ষই তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড। মূলত ঈমানই তার পারিবারিক বন্ধনের স্থাপক, সামাজিক সম্পর্কের নির্দেশক এবং তার জাতীয় পরিচয়ের নির্ণায়ক। তার ভালোবাসা ও বিরাগ, তার বন্ধন ও বিচ্ছেদ, তার সংহতি ও সংগ্রাম সবই হয়ে থাকে তার পালনকর্তার সন্তুষ্টির ভিত্তিতে। তার অস্তিত্ব ও চেতনার সকল উদ্দেশ্য, তার জীবন-মরণের সমস্ত আকুতি একমাত্র তার পালনকর্তার জন্যেই নিবেদিত। তাই সে বলে: “আমার সালাত, আমার ইবাদাত, আমার জীবন ও মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।” (কুরআন, ৭:১৬২)।

এই মহান তাওহীদী চেতনার আলোকে একজন মুসলিমকে যদি ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে কিছু মানতে হয়, তবে সেই জাতীয়তার একমাত্র সংজ্ঞা হলো: “কালেমার ছায়ার নিচে যারা আছে তারা এক জাতি, আর যারা এর বাইরে তারা অন্য জাতি।”

প্রচলিত দেশ-ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ইতিহাস সম্পর্কে যিনি প্রায় কিছুই জানেন না, তিনিও এটুকু ধারণা করতে পারেন যে, মুসলিম বিশ্বে এ মতবাদের জন্ম হয় নি। কেউ একটু অনুসন্ধান করলেই জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করে তাদেরকে বিভক্ত ও দুর্বল করা, অতঃপর তাদের পরস্পরের মধ্যে গোত্রীয় ও আঞ্চলিক জাত্যভিমান সঞ্চার করে ইসলামী খিলাফাতকে তছনছ করে দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে উপনিবেশ স্থাপন করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন ও তাদেরকে অধীনস্থ করে রাখার উদ্দেশ্যেই ইসলামের পশ্চিমা দুশমনরা এ বিষাক্ত জাতীয়তাবাদ তথা আঞ্চলিকতাবাদের জন্ম দিয়েছে। জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এ অস্ত্রের আঘাতে তারা ইসলামী খিলাফা ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে এবং আজও একের পর এক মুসলিম রাষ্ট্রে আগ্রাসন ও লুণ্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে। ভাষাগত ও আঞ্চলিক চেতনা স্বভাবতই সঙ্কীর্ণ ও পরবিদ্বেষী হয়ে থাকে, এর ভিত্তিতে গঠিত জাতি সর্বদাই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও অপরাপর জাতিকে তুচ্ছ ভাবে। এ অহমিকার বশে নিজের আধিপত্যের নেশায় অন্যান্য জাতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয় এবং সবসময়ই আগ্রাসন ও যুদ্ধের জন্যে তৈরি থাকে। এ জাতীয়তাবাদই পরপর দু’টি বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, যার পরিণাম সাত কোটি মানুষের প্রাণহানি।

পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর চেতনা হলো আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে সকলের কল্যাণকামনা, সবার জন্যে শান্তি ও ভালোবাসা। তাই সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়, সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তির জন্যে প্রয়োজন মুসলিম উম্মাহ্-চেতনা।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক। শিক্ষক, শাহবাগ জামিয়া মাদানিয়া জকিগঞ্জ, সিলেট, বাঙলাদেশ। a-haque@live.com

ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশি, বাঙালি, মুসলিম, উম্মাহ, ক্বাওমিয়্যাত, আত্মপরিচয়
বিষয়শ্রেণী: ইসলাম
শেয়ার করুনঃ
১৫৮ বার পঠিত, ৭ টি মন্তব্য
২ জনের পছন্দ
রেটিং দিতে লগইন করুন
পাঠকের মন্তব্য:
মন্তব্যের জবাব দিতে সমস্যা হলে এখানে ক্লিক করুন এবং নতুন পাতায় মন্তব্য লিখুন
639440
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:১৩
আসমা আব্বাসী লিখেছেন : এভাবে চলাফেরা, নৈতিকতা, বোধ-বিশ্বাস সবকিছুতেই আমরা দু’জন দুই মেরুর। আমাদের মুখের ভাষায় মিল, কিন্তু বুকের ভাষায় মিল নেই। সম্পর্ক মূলত হৃদয়ঘটিত বলে, মুখের মিলে শেষ পর্যন্ত জীবনে জীবন মেলানো যায় না। বৈপরিত্যটা অন্তর্গত, আর ঐক্য বাইরের। ভেতর-বাহিরের দ্বন্দ্বে ভেতরে ভেতরে আমরা বন্ধ হয়ে থাকি। সহাবস্থান তাই সহবোধ দেয় না। এ আড়ষ্টতা নিয়ে হৃদ্যতা গড়ে ওঠা কি সহজ? কীভাবে আমি ও তিনি জাতি-বিবেচনায় এক হবো?

অসাধারণ লেখা। ভাই চালিয়ে যান। দোয়া রইল।
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১১:০৫
632502

আবদুল হক লিখেছেন : আসমা আব্বাসী, আপনাকেও ধন্যবাদ, দীর্ঘ লেখাটা মন দিয়ে পড়লেন বলে।
639442
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:১৭
আসমা আব্বাসী লিখেছেন : এভাবে চলাফেরা, নৈতিকতা, বোধ-বিশ্বাস সবকিছুতেই আমরা দু’জন দুই মেরুর। আমাদের মুখের ভাষায় মিল, কিন্তু বুকের ভাষায় মিল নেই। সম্পর্ক মূলত হৃদয়ঘটিত বলে, মুখের মিলে শেষ পর্যন্ত জীবনে জীবন মেলানো যায় না। বৈপরিত্যটা অন্তর্গত, আর ঐক্য বাইরের। ভেতর-বাহিরের দ্বন্দ্বে ভেতরে ভেতরে আমরা বন্ধ হয়ে থাকি। সহাবস্থান তাই সহবোধ দেয় না। এ আড়ষ্টতা নিয়ে হৃদ্যতা গড়ে ওঠা কি সহজ? কীভাবে আমি ও তিনি জাতি-বিবেচনায় এক হবো?

অসাধারণ লেখা। ভাই চালিয়ে যান। দোয়া রইল।
639444
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:১৭
আসমা আব্বাসী লিখেছেন : এভাবে চলাফেরা, নৈতিকতা, বোধ-বিশ্বাস সবকিছুতেই আমরা দু’জন দুই মেরুর। আমাদের মুখের ভাষায় মিল, কিন্তু বুকের ভাষায় মিল নেই। সম্পর্ক মূলত হৃদয়ঘটিত বলে, মুখের মিলে শেষ পর্যন্ত জীবনে জীবন মেলানো যায় না। বৈপরিত্যটা অন্তর্গত, আর ঐক্য বাইরের। ভেতর-বাহিরের দ্বন্দ্বে ভেতরে ভেতরে আমরা বন্ধ হয়ে থাকি। সহাবস্থান তাই সহবোধ দেয় না। এ আড়ষ্টতা নিয়ে হৃদ্যতা গড়ে ওঠা কি সহজ? কীভাবে আমি ও তিনি জাতি-বিবেচনায় এক হবো?

অসাধারণ লেখা। ভাই চালিয়ে যান। দোয়া রইল।
639445
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:১৭
আসমা আব্বাসী লিখেছেন : এভাবে চলাফেরা, নৈতিকতা, বোধ-বিশ্বাস সবকিছুতেই আমরা দু’জন দুই মেরুর। আমাদের মুখের ভাষায় মিল, কিন্তু বুকের ভাষায় মিল নেই। সম্পর্ক মূলত হৃদয়ঘটিত বলে, মুখের মিলে শেষ পর্যন্ত জীবনে জীবন মেলানো যায় না। বৈপরিত্যটা অন্তর্গত, আর ঐক্য বাইরের। ভেতর-বাহিরের দ্বন্দ্বে ভেতরে ভেতরে আমরা বন্ধ হয়ে থাকি। সহাবস্থান তাই সহবোধ দেয় না। এ আড়ষ্টতা নিয়ে হৃদ্যতা গড়ে ওঠা কি সহজ? কীভাবে আমি ও তিনি জাতি-বিবেচনায় এক হবো?

অসাধারণ লেখা। ভাই চালিয়ে যান। দোয়া রইল।
639446
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১০:২৫
পল্লব লিখেছেন : খুব ভালো বিশ্লেষণ!! ধন্যবাদ।
০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১১:০৬
632506

আবদুল হক লিখেছেন : প্রেরণাদায়ক মন্তব্যের জন্যে অনেক ধন্যবাদ!
মন্তব্য লিখতে লগইন করুন
আবদুল হক