১২ ফেব্রুয়ারী ২০১০ জুমার দিন। সকালেই খবর পেলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিউদ্দিন মাসুম ভাই শাহাদাত বরন করেছেন।সে দেব পাহাড়ের শিবিরের একটি মেসে থাকত। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরী ছুরিকাঘাতে তিনি শহীদ হন। ছুরিকাঘাত করে সন্ত্রাসীরা চম্পট দেয় ও আজ পর্যন্ত হাওয়া মানে ধরা ছোয়ার বাইরে। তারা এসেছিল মূলত শিবির নেতা মুহাইমিনকে টার্গেট করে। আল্লাহর রহমতে সে ছুরির কোপ খেয়েও বাচতে সক্ষম হয়। শুরু হয় আওযামী গুপ্ত হত্যা।
সে দিনের সেই গুপ্ত হত্যার নায়কদের উদ্দেশ্য ছিলঃ
১. ছাত্র শিবিরের নেতা মুহাইমিনকে হত্যার মধ্য দিয়ে শিবির কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তথা সারা দেশ থেকে নেতৃত্ব শূন্য করবে।
২. ছাত্রলীগ শিবির কর্মী মেরে ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবী করে শিবির এর উপর দায় চাপিয়ে সারা দেশে পুলিশের মাধ্যমে ক্র্যাকডাউন চালাবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারুক হত্যার মাধ্যমে দায় চাপানোর নীতি ক্ষমতাসীনরা শুরু করেছিল। রাবির সেক্রেটারি শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ভাইকে প্রকাশ্যে মারা ছিল এর জঘন্যতম প্রমান।
অফিস সম্পাদক বর্তমান সভাপতি ইসমাইল ভাইয়ের ফোনঃ
সকালে চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তরের তৎকালীন অফিস সম্পাদক বর্তমান সভাপতি ইসমাইল ভাইয়ের ফোন পাই।
বের হওয়ার পথে পথ আগলে ধরেন আম্মু। আমি আমার সম্মানীয় আম্মুকে বলি আমার মত একটি ছেলেকে খুনীরা শহীদ করে দিল আর আমি তার জানাযাতে যেতে পারবনা এমন স্বার্থপর আমি হতে পারবনা । একটি খুনের প্রতিবাদ না হলে আরো অনেক খুন হবে মা । মা ঐ ছেলেটির পরিনতি তোমার ছেলের ও তো হতে পারতো ! মা আমাকে বাধা দিওনা জানাযাতে যেতে দাও । মাকে রাজী করিয়ে জানাযাতে যাই।
ক্ষমতাসীনরা আমাদের ভাইকে মেরে জানাযা পড়ার জন্য লাশ দিতে চাচ্ছিলনা এবং দাবী করতে থাকে মহিউদ্দিন মাসুম ছাত্রলীগ। লাশ নিয়ে এ জঘন্য রাজনীতি তৌহিদী ছাত্রজনতা মেনে নিতে পারেনি।
আমরা ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে চট্টগ্রাম মেডিকেলের চারপাশে অবস্থান নিই। জানাযা উত্তর স্বতস্ফূর্ত জনতা নেতাদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে প্রতিবাদ মিছিল বের করে। ৫/৭ হাজার মানুষের বাধঁভাঙ্গা জোয়ার কর্নফুলীর উত্তাল ঢেউয়ের সাথে মিশে অন্যায় গুপ্ত হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছিল।
এই সময় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বসে স্বরাষ্টপ্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু নির্দেশ দিচ্ছিলেন প্রতিবাদী জনতাকে আঘাত করার জন্য। মিছিল শেষ হওয়ার একটু পূর্বে জামালখান মোড় দিয়ে যখন মিছিল অতিক্রম করছিল তখন শুরু হয় এলোপাতাড়ী টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট আর লাঠি পেটা । ভয়ানক সে দৃশ্য। সাতকানিয়ার নির্বাচিত এম.পি সাহেবের অনুরোধ ও পুলিশকে নিবৃত্ত করতে পারেনি।
শুরু হয় গ্রেফতার ৮৬+২৪+৩=১১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের সকল থানার হাজতী রুম শিবির নেতাকর্মীদের দিয়ে ভরে ফেলা হয়। এই সরকার আসার পরে শিবিরের উপর প্রথম সরকারী ক্র্যকডাউনের আমরাই প্রথম স্বীকার ।
অবশেষে আমিও গ্রেফতার হয়ে গেলাম।
অবশেষে আমিও গ্রেফতার হয়ে গেলাম।গাড়ীতে তোলার সময় পুলিশ অনেককেই মারছিল । আমি প্রথমে বিকট এক চিৎকার দিলাম তাতে পুলিশ হতচকিয়ে গেল । তারপর পুলিশ ভাইদের দিকে তাকিয়ে হেঁসে বললাম আমরা সবাই আপনাদের গ্রেফতার কর্মসূচীতে সহযোগিতা করছি । এই দেখেন আমি গাড়ীতে উঠছি অন্যদের বললাম সবাই পুলিশ ভাইদের সহযোগিতা করে শান্তিপূর্নভাবে গাড়ীতে উঠ। আর পুলিশ ভাইদের বললাম এরা তো অপরাধী না তবে কেন মারছেন ? অনেক পুলিশ ভাই মারামারি বন্ধ করে অন্যদের বন্ধ করতে বলল । এরি মধ্যে পুলিশের মারামারিতে অনেকে গুরুতর আহত হয়ে যায়। সাংবাদিক ছবি তুলতে আসলে অনেকেই মুখ লুকাতে চাইল আমি তাদের বললাম মুখ লুকাচ্ছ কেন ? আমরা কি অপরাধী ? ভি চিহ্ন দেখাও । আমার দেখাদেখি অনেকেই আহত হওয়ার পরও হাস্যজ্জ্বল মুখে ভি চিহ্ন দেখাল। যা পরদিন অনেক পত্রিকাতে এসেছিল ও আমাদের ভাইদের মনোবল বৃদ্ধি করেছিল।
চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার বন্দীদের কক্ষগুলোর পরিবেশ:
বিদঘুটে অশস্তিকর এক পরিবেশ চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানার বন্দী কক্ষটির । ছোট একটি রুম ১০ফুট দৈর্ঘ্য ১০ ফুট প্রস্থ।১২ ফেব্রুয়ারী ২০১০ দুপুর ১২ টা থেকে ৬০ জন বন্দীকে ২৮ ঘন্টা বন্দী থাকতে হয়েছে। অনেক মানুষের ঘামের নাকজ্বালা গন্ধ , এক ঝাকঁ মশার কামড় , উন্মুক্ত বাথরুমের পেটগুলানো বমি উদ্রেককারী অসম্ভব গন্ধ। লাইট নেই বলে আলো স্বল্পতা । জুমার দিন ফজর নামাজের পর পর অনেকে কর্মসুচী স্থানে চলে আসাতে গোসল করা হয়নি । বন্দী কক্ষের ফ্লোর ছিল অসহ্য নোংরা । তার উপর দাগী আসামীদের সিগারেটের ধোয়াঁ নির্যাতন। রিমান্ডে নির্যাতিতদের বুকফাটা আর্তনাদ। কক্ষের মধ্য ঘুমানোর জন্য নেই কম্বল বালিশ । পানির তীব্র সংকট । প্রাকৃতিক কাজ সারার পানি নেই , খাওয়ার পানি নেই , খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই । সকালের হালকা নাস্তা খেয়ে রাত পর্যন্ত উপোস থাকতে হয়েছে । রাত ১০টার দিকে শুভাকাঙ্খীরা খাওয়া পাঠানোর পর অসম্ভব ক্ষুধা নিভৃত করি ।মাঝে মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পন্ন পুলিশ সদস্য ভাইদের অকথ্য গালি। স্বাধীন দেশের থানা হাজত খানা কতই না মানবাধিকার ও মানবিকতার সহায়ক???
আপনারাই বলুন এই র্নিঘুম রাত একটি কঠিন স্মৃতি নয় কি?।
এই রকম অসহনীয় পরিবেশে আমরা হাফলিটার পানিকে অল্প অল্প করে সবাই খেয়েছি। একজনের কোলের উপর অন্যজন ঘুমিয়েছি। একজনের চোখের কান্না অন্যজন মুছে দিয়েছি । পরম মমতায় মাথার চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। টেনশন ভূলে চিৎকার করে থানা হাজতে শাহাদাতের গান গেয়েছি । তায়াম্মুম করে নামাজ পড়েছি। থানা হাজতে আমার আম্মু আমার জন্য দেশী মুরগী ফ্রাই করে পাঠিয়েছিলেন ।ফেনীর আবুবকর ভাই মনে করেছিলেন তার আম্মু পাঠিয়েছেন ।আমি এখনো তার ভূলটি ভাঙ্গিয়ে দিইনি। তার আনন্দ করে খাওয়ার দৃশ্যটি আমাকে নাড়া দেয় এখনো।
আমাদের জজকোর্ট যাত্রাঃ
২০১০ ফেব্রুয়ারীর ১৩ তারিখ দুপুরে একসাথে অনেক জনকে হ্যন্ডকাফ ও রশি দিয়ে বেধেঁ চট্টগ্রাম জর্জকোর্টের উদ্দেশ্যে আমাদের থানা থেকে বের করা হয়। থানার গেটদিয়ে যখন বের হচ্ছি তখন দেখলাম অসংখ্য সাংবাদিক এর ক্যামেরার আলো জ্বলে উঠছে আর দুরে দাড়িয়ে আছে আম্মু ,ছোট ভাই ও বোন ।চোখে অসহায় দৃষ্টিতে নিয়ে আমার দিকে । আমি হেসে তাদের সাহস জোগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম।
চট্টগ্রাম জর্জকোর্টে আমরাঃ
দুই পক্ষের আইনজীবীদের তীব্র হট্টগোলের মধ্যে শুনানি চলছে। রাষ্টপক্ষ বলছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর জন্য এই মিছিল । আমরা কষ্ট ভূলে মনে মনে হেসে দিলাম । আহারে কোথাকার কি ! পান্তাভাতে ঘি। আমাদের আইনজীবি বেশীরভাগ জাতীয় পত্রিকা হাতে নিয়ে বললেন মিছিলের কোন ছবিতে লাঠি নেই , রাস্তায় কিছু স্যন্ডেল ছাড়া কোন কংকর নেই । এতে প্রমান হয় শান্তিপূর্ন মিছিলে পুলিশের অযাচিত বাড়াবাড়ি। অনেকগুলো ধারার সাথে ৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬(২) ধারা দিয়ে মামলা করে আমাদের জামিন না মন্জুর করে ১১০ জনের বিশাল বন্দীবহরকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হল।
শুরু হল আমার জেল জীবন ।বিভিষিকাময় আওয়ামী কারাগার যাত্রা। দিনটি ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১০।
মতলুব লিখেছেন : থানা হাজতে আমার আম্মু আমার জন্য দেশী মুরগী ফ্রাই করে পাঠিয়েছিলেন ।ফেনীর আবুবকর ভাই মনে করেছিলেন তার আম্মু পাঠিয়েছেন ।আমি এখনো তার ভূলটি ভাঙ্গিয়ে দিইনি। তার আনন্দ করে খাওয়ার দৃশ্যটি আমাকে নাড়া দেয় এখনো।
আপনার এই কথায় সত্যিই চোখে পানি এসে গেল!
কি সেকুলাস আমাদের রাজনীতি!
ফিদেল বিডি লিখেছেন : আওয়ামী লীগের আগের আমলে কারাগারে যাওয়া অনেকের মুক্তি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে ছাত্রজীবনে অনেক কাজ করেছি। চট্টগ্রাম কারাগারের শিবির ওয়ার্ডকে তালপট্টি বলা হতো। পুরোপুরি সাংগঠনিক পরিবেশে সেটি পরিচালিত হতো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের বিভীষিকাময় জীবন, বহদ্দারহাটের ঘটনার পর আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে কাজ করা ইত্যাদী ইত্যাদী। স্মৃতি গুলো এখনো নাড়া দেয়। আপনি কারাজীবন নিয়ে লিখুন।
রুবেল আহমদ জুবের লিখেছেন : : "পৃথিবীর বাতিল শক্তিগুলো এ জমিন থেকে আল্লাহর নামকে মুছে দিতে চায় আমরা যুবকেরা বেঁচে থাকতে তা হতে পারে না"
" হয়
বাতিলের উত্খাত করে
সত্যের প্রতিষ্টা করব মোরা
নচেৎ সে চেষ্টায়
আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে"
জিসান আহমেদ লিখেছেন : আগে পুলিশ আর জেলকে ভয় পাইতাম। এখন কেন যেন ইচ্ছে করছে, "ইস যদি একবার জেলে জাইতে পারতাম। কাল হাসরের ময়দানে আল্লাহকে বপ্লতে পারতাম, ইয়া শুধু তোমার জন্য ..........
কীবোর্ড
Bijoy UniJoyPhoneticEnglish
নাম:
মন্তব্য:
তথ্য পাঠানো হচ্ছে, অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন
১১
738885
২৮ এপ্রিল ২০১২; দুপুর ১২:৪৪
আবু জারীর লিখেছেন : থানা হাজতে বসে মুর্গী ফ্রাই খাওয়ার মজাই আলাদা। যেখানে ডল পুড়িকেই বেহেস্তের খাবার মনেহয় সেখানে যদি মুর্গী ফ্রাই পাওয়া যায় তাহলেতো কোন কথাই নেই। আপনার আম্মাকে সেলুট।
তোমাদের পৃথিবীর সকল বৃদ্ধাঙ্গুলী