ফেব্রুয়ারী মাসে আমাদের মাঝে এক ধরণের ভাষা প্রেম জাগ্রত হয়। যেভাবে মার্চ কিংবা ডিসেম্বর মাসে আমাদের দেশ প্রেম উতলে পড়ে।
টিভি চ্যানেল, নাটকপাড়া, পত্রিকা-সাময়িকী গুলোতে ফেব্রুয়ারীকে নিয়ে চলে নানা আয়োজন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মত আমাদের দেশীয় মিডিয়াগুলোও এই মাসগুলোকে দিবসগুলোকে উপলক্ষ্য বানিয়ে ব্যবসার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভাষার সংগ্রামের এই মাসে অনেকের লেখা ইতিমধ্যে এসেছে, আসবে।
ভাষার এই মাসে কোন গুরু গম্ভীর লেখা নয়। মজার একটি ঘটনা বলব।
গ্রামে দল বেঁধে স্কুলে যাওয়া, টিপিন পিরিয়ডে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চলে আসা, বিকেলে দলবেঁধে গোল্লা ছুট কিংবা ফুটবল খেলা ছিল নিয়মিত কাজ। ফেব্রুয়ারী মাস আসলে (প্রভাত ফেরী, ফুল চুরি) এ সব ছিল কমন বিষয়।
সেই বার মাত্র ক্লাস নাইনে উঠলাম। গ্রামে একটি প্রবাদ আছে, ছেলে-মেয়ে নাকি নাইনে উঠলে পাখা গজায়। পাখা গজিয়েছিল কিনা জানি না, তবে দূরন্তপনা একটু বেড়েছিল। এখন বুঝতে পারিছ তা ছিল বয়সের দোষ!!
ফেব্রুয়ারী মাসে বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে ফুল চুরি করা এবং মুরগী রান্না করে খাওয়ার ধুম পড়ে যেত।
যেই ভাবনা সেই কাজ।
মহিন, জাকের, হারুন, ফারুক, করিম আর দলনেতা হিসেবে আমি ঠিক করলাম ফুল কোথায় পাওয়া যায়? এ নিয়ে রীতিমত গবেষণা শুরু হলো। মহিন জানালো, রতন স্যারদের বাড়ীতে চমতকার ফুল আছে এবং সাদা গোলাপ গুলো নাকি ছিল দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার মত। ব্যাস। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সিদ্ধান্ত হলো ফুলগুলো হস্তগত করতে হবে।
রাত ১১ টার দিকে চললাম স্যারের বাড়ীর উদ্দেশ্যে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরসা ফারুকের টর্চ লাইট। স্যারদের বাড়ীটা অনেক বড় এবং জঙ্গলে ভরা। রাত তো দূরের কথা দিনের বেলাও শুনশান নীরবতা থাকে প্রাচীন বিরাট এই জমিদার বাড়ী জুড়ে। লোকেশন বিন্যাস ছিল ----ফুল ছিঁড়বে জাকের। তাকে সহযোগীতা করবে হারুন এবং মহিন। রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে ফারুক ও করিম। আর আমি লোকজনের চলাচলের উপর দৃষ্টি রাখব। অপরিচিত কেউ আসলে তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে মোটিভেট করা।
স্যারদের বাড়ীর সামনে গিয়ে দেখলাম ফুল বাগানে কমপক্ষে ১০০ ওয়াটের দুইটা লাইট জ্বালিয়ে ফুলের জন্য নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করা হয়েছে। সাহস সঞ্চার করে জাকের বাগানের ভেতর দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুল বাগানে পৌঁছে গেল। কয়েকটা ফুল ছিঁড়তেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে তেড়ে আসা দেখে সবাই এক যোগে দিল ভৌঁ দৌড়। সবাই এক দৌড়ে মূল রাস্তায় উঠে আসলাম। কেউ বলছিল আরেকটু পরে আসলেই পারতাম। জাকির বললো মহিন কাশি না দিলেই পারতো। মহিনের যুক্তি হচ্ছে একটি মশা আমার মুখে ঢুকে পড়েছে, আমার কি দোষ! এ নিয়ে পারস্পরিক দোষারোপ আর অভিযোগ। হঠাত আমার মনে হলো, হারুন কই? সবাই বললো, হ্যাঁ ঠিকইতো হারুন কই। তখন মোবাইলের ব্যবহার ছিল না। কিভাবে খোঁজ নেই? পেছনে গেলেও বিপদ আছে। কারণ স্যার যদি বকা দেয় বা সন্দেহ করে। বাজারে এসে আরেক ফ্রেন্ডকে ম্যানেজ করে স্যারদের বাড়ীতে পাঠালাম।
কথা মত সে স্যারের বাড়ী গিয়ে স্যারকে খোঁজ করতেই স্যার তাকে ঘরে নিয়ে বসাল। এত রাতে আসার কারণ জানতে চাইলে স্যারকে সে জানাল হারুন নাকি বাংলার একটা সমস্যা নিয়ে স্যারের বাড়ীতে এসেছে। এখন তার কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। স্যারতো তাজ্জব!! এত রাতে? তাও বাংলার সমস্যা নিয়ে হারুন!!! স্যার তো ঘটনাটা বুঝেছে। সব শিয়ালের একই ডাক!
সারারাত আর হারুণের খবর নেই। সকাল বেলা প্রভাত ফেরীতে তার সাথে দেখা। পরে তার মুখে যে ঘটনা শুনলাম তা শুনে কেউই হাসি ধরে রাখতে পারিনি। কুকুর যখন তেড়ে এসেছিল, সবাই রাস্তার দিকে দৌড় দিলেও সে দৌড় দিয়েছিল স্যারদের শশ্মানঘাটের দিকে। একেতো কুকুরের দৌড়ানি, তার উপর ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে কতদূর গিয়ে দেখল বিশাল কালো একটা কি যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এ দেখে সে সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে গেল। কুকুরের শব্দ শুনে স্যার বের হয়ে এসে দেখে হারুন চিতপটাং হয়ে পড়ে আছে। পরে স্যার তাকে বাসায় নিয়ে মাথায় তেল পানি দিয়ে বাতাস করে জ্ঞান ফিরিয়েছিল। আর সে যে কালো জিনিসটা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল তা ছিল মূর্তি।
এই হারুণ ছিল আমাদের পুরনো বাড়ীর সম্পর্কে আমার কাজিন। আমাদের মধ্যে সবচে হাবাগোবা টাইফের। তার এই হাবাগোবা ভাবের জন্যই তাকে নিয়ে আমরা খুব হাসতাম। তবে, ব্যবহার আর বন্ধুদের জন্য তার আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না। তাকে নিয়ে প্রায়ই আমরা এ ধরণের ঝামেলায় পড়তাম।
আজ সেই বন্ধুদের কেউ কেউ ইউরোপ, কেউ মধ্যপ্রাচ্যে, কেউ দেশে টুকটাক ব্যবসা বানিজ্যের সাথে জড়িত, কেউ বা চাকুরি করছে।
খুব সহজে কারো সাথে কারো দেখা হয় না। মাঝে মাঝে ফোনে বা স্কাইপিতে কথা হয়। গত ঈদে একটা ঈদ পুন:র্মিলনী করেছিলাম। সেখানে কয়েকজনকে পেয়ে যেন পুরনো দিনে ফিরে গিয়েছিলাম।
সেই রতন স্যার এখন আর নেই। গত কিছুদিন আগে মারা গিয়েছেন। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন চিরকুমার। বাংলা পড়াতেন তিনি। আওয়ামীলীগের সাপোর্টার হলেও ছিলেন স্পষ্টবাদী। খুব আদর করতেন আমাদের। বাংলাকে তিনি নিজের মত করে পড়াতেন। তাই সে সময় স্কুলে পাসের হার ৩% হলেও (২০০১ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ১৭%) বাংলায় কেউ ফেল করেনি।
আজকাল বিশ্বায়নের যুগে আপনি ইচ্ছে করলেও বাংলা ভাষাকে সব জায়গায় ব্যবহার করতে পারবেন না। আজ দেশে কি বিদেশে সব জায়গায় ইংরেজী না জানলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। ভারতীয়রাও তো ইংরেজীতে অনেক ভালো। তারা তো বিদেশেও হিন্দিতে কথা বলে। এটা তাদের সংস্কৃতির বিজয়। দেশপ্রেম, ভাষা প্রেম। আমরা নিজেদের সংস্কৃতি ভুলে তাদের সংস্কৃতিকে লালন করছি। এটা আমাদের দেউলিয়াত্ব হলেও তাদের জন্য গর্ভের।
আমরা কেন পারি না? পারি না এজন্যই যে আমাদের মাঝে সেই সাংস্কৃতিক সচেতনতা নেই। প্রচন্ড অভাব রয়েছে দেশপ্রেমের।
আজকাল কিন্ডার গার্টেন গুলোতে বাংলাকে কোন মতে পড়ানো হয়। অনেক ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র/ছাত্রী বাংলা বলতে পারলেও লিখতে জানে না। এটা কি আমাদের হীনম্মন্যতা নয়?
স্বপ্নতরী লিখেছেন : ক্যাকুলেট করলে অবস্যই আমার উত্তরটা পেয়ে যাবেন....
১২
641080
০৮ ফেব্রুয়ারী ২০১২; রাত ১২:৩৭
এম এম ওবায়দুর রহমান লিখেছেন : একটা সময় ছিল যখন একজন লেখকের একটা উপ্যনাস বা কবিতার বই ২০০০/৪০০০ কপি বিক্রি হত। এখন ৫০০ হতেই চায় না।
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বড় অস্থির । আবেগ অনুভূতিও কম।
Orion লিখেছেন : আমাদের একটা নিজ্বস বণ্রমালা আছে। ক, খ, গ, ঘ। আমি গবি্রত বাংলা আমার মায়ের ভাষা। দু্্ঃখজনক হলে ও সতি্য় আমার বাচছাদের বাংলা লিখতে পড়তে শিখাতে পারি নি। কিন্তু ওরা বাংলা বলতে পারে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ